অন্যান্য

নেটওয়ার্ক জেনারেশনের আদ্যোপান্ত

স্মার্টফোন তো ব্যবহার করছেন আজ অনেকদিনই পার হলো, তা বলছি এই যে ফোন কেনার আগে প্রসেসর নিয়ে যুদ্ধে নামেন যে কোনটা ভালো কোনটা মন্দ, তা সেইসময় তো নেটওয়ার্ক কোন জেনারেশন অব্দি সাপোর্টেড তা নিয়েও একটু মাথা ঘামাতে হবে যে? ভুলে গেলে তো চলবে না যে আমরা 4G যুগে রয়েছি, আর ওদিকে সামনে 5G-ও আসছে, knocking at the door অবস্থা। তো এই “G” অর্থ কি, কি করে, খায় না মাথায় দেয় শ্যাম্পুর মতো, সেটা নিয়েই চলুন একটু আড্ডা দিই আগামী ৭ মিনিট।

0G: আপনি যদি টেলিফোন যুগের কথা মনে করতে পারেন, তাহলে সেটাকেই বলা যায় Zero G, অর্থাৎ অ্যানালগ যুগের তারযুক্ত যোগাযোগব্যবস্থা, যাকে বলা যায় Pre-Cellular যুগ।

1G: ১৯৭৯ এ মার্কেটে এলো অ্যানালগ যুগের আরেকটু আধুনিক টেলিফোনিক ব্যবস্থা, যাতে আরেকটু বেটার কল-কোয়ালিটি এসেছিলো। মার্কেটে আমরা বা আমাদের বাবা-মা যেসব টেলিফোনে অভ্যস্ত হয়েছিলেন, সেগুলোই মূলত 1G বলা যায়। 2G আসার আগ পর্যন্ত মার্কেট ডমিনেট করেছিলো এই অ্যানালগ প্রযুক্তি।

2G: এই সেই 2G মার্কেটে এসেছিলো ১৯৯১ সালে, যার স্পিড ছিলো 28.8kbps। ফিনল্যান্ডে Radiolinja নিয়ে আসে GSM প্রযুক্তি যাকে আমরা 2G হিসাবেই অভিহিত করি। আমরা যা দ্বারা পরিচিত হয়েছিলাম ফোনের সাথে। রাতের পর রাত জেগে জেগে কতো কথাই না বলেছিলেন এককালে। আহা! মূলত 2G হওয়ার যোগ্যতা কি কি আসুন জেনে নিই –
• টেলিফোনের চেয়ে উন্নতর ফোন কল কোয়ালিটি
• এসএমএস আর এমএমএস সাপোর্ট
• ইন্টারনেট কানেক্টিভিটি
• 2.5G: এসেছিলো বেটার ইন্টারনেট কানেক্টিভিটি GPRS নিয়ে
• 2.75G: এক নতুন স্টেপ ৩ জি’র দিকে, যাতে আবারও ইন্টারনেট স্পিডের উন্নতি হয়েছিলো EDGE কানেক্টিভিটি নিয়ে।

2G এর সময় থেকেই মোবাইল ফোনের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। মানুষ তার দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কাজে মোবাইল ফোন ব্যবহার শুরু করে। কিন্তু 2G এর ডাটা ট্রান্সফার স্পিড মানুষের চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছিলো। তাই বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি 2G এর বিকল্প খুঁজতে শুরু করে। ফলাফল হিসাবে আমাদের কাছে আসে মোবাইল ফোনের নতুন প্রজন্ম 3G।


2G এবং 3G এর মাঝে মূল টেকনোলজিকাল পার্থক্য হলো যে 3G তে ডাটা ট্রান্সফারের জন্য “সার্কিট সুইচিং” পদ্ধতির বদলে “প্যাকেট সুইচিং” পদ্ধতি  ব্যবহৃত হয়। যার ফলে ইন্টারনেটে দ্রুত সংযোগ স্থাপন করা যায় এবং ডাটা ট্রান্সফার স্পিড বা ইন্টারনেট স্পিড বেশি হয়। থ্রিজি প্রযুক্তিকে “মোবাইল ব্রডব্যান্ড”ও বলা হয়। 3G প্রযুক্তি হতে হলে ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (ITU) দ্বারা স্বীকৃত ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল টেলিকমিউনিকেশন-২০০০ (IMT-2000) এর নিয়মাবলী মেনে চলতে হয়। 3G প্রযুক্তির মাধ্যমে মোবাইলে কথা বলা ছাড়াও ওয়্যারলেস ইন্টারনেট ব্যবস্থা, ভিডিও কল এবং মোবাইল টিভি উপভোগ করা যায়। থ্রিজি ইন্টারনেটে ডাটা ট্রান্সফার স্পিড ন্যুনতম ১৪৪ কিলোবিট পার সেকেন্ড থাকবে বলে আশা করা হয় এবং এই স্পিড সর্বোচ্চ কয়েক মেগাবিট পার সেকেন্ড পর্যন্ত হতে পারে।

CDMA: কোয়ালকমের হাত ধরে CDMA (Code Division Multiple Access) প্রযুক্তি আসে মার্কেটে, যা নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম অপারেটর সিটিসেল দীর্ঘদিন কম্পিটিটিটরদের চেয়ে বেটার সার্ভিস দিয়ে আসতো দেশে।

3G: অক্টোবর ১, ২০০১WCDMA প্রযুক্তিতে NTT DoCoMo জাপানে সর্বপ্রথম জাপানে নিয়ে আসে 3G নেটওয়ার্ক।

CDMAone: ২০০২ এ আসে 3G’র চেয়ে একটু বেটার সার্ভিস প্রোভাইড করতে।
3G নেটওয়ার্ক হতে প্রয়োজনীয় প্যারামিটার কি কি? জানতেন চান? এইযে-
• আগের জেনারেশনের চেয়ে অধিকতর উন্নত ভয়েস কল কোয়ালিটি
• ভিডিও কলিং
• 144kbps মিনিমাম স্পিড

3.5G : নতুন স্টেপ আগামী জেনারেশনের জন্য
3.75G : HSPA+ স্পিড মার্কেটে এসেছিলো, 4G-র দিকে আরেক ধাপ অগ্রগতী
3.9G : 4G-র দিকে লাস্ট স্টেপ, এরপরেই আসে 4G

২০০৯ সালের দিকে দেখা যায় যে, স্ট্রিমিং মিডিয়ার মত ব্যান্ডউইথ-ইন্টেন্সিভ অ্যাপ্লিকেশনগুলোর জন্য থ্রিজি ইন্টারনেট যথেষ্ট নয়। স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি পরবর্তী ধাপ বা ফোরজি টেকনোলজির লক্ষ্যে কাজ করতে থাকে।

4G: ফোরজি খ্যাতি নিয়ে সর্বপ্রথম যে দুটি প্রযুক্তি বাজারে আসে তারা হলো ওয়াইম্যাক্স স্ট্যান্ডার্ড (WiMAX) এবং লং টার্ম ইভালুয়েশন বা এলটিই স্ট্যান্ডার্ড (LTE)। ২০০৯Norway আর Stockholm এ 4G চালু হয়। আর আমেরিকাতে চালু হয় ২০১১ তে Verizon এর হাত ধরে।

4.5G: আগামী জেনারেশনের দিকে নেক্সট স্টেপ যাকে বলা যায় LTE Advanced Pro!

একটি ফোরজি সিস্টেমে ITU স্বীকৃত IMT Advanced এর যোগ্যতা থাকতে হবে। আগের যে কোনো জেনারেশন থেকে ফোরজির প্রধান প্রযুক্তিগত পার্থক্য হচ্ছে এটি যোগাযোগ স্থাপনের জন্য সার্কিট-সুইচ পদ্ধতি একেবারেই ব্যবহার করে না বরং “অল-ইন্টারনেট প্রটোকল” ভিত্তিক যোগাযোগ তৈরি করে।

 

ফোরজির বেশ কিছু প্রযুক্তি বাজারে রয়েছে – যেমন HSPA+ 21/42, WiMAX এবং LTE। তবে অনেকে এদের মাঝে শুধু LTE কেই প্রকৃত ফোরজি বলেন। কারণ অন্য যেকোন প্রযুক্তির চেয়ে LTE এর স্পিড বেশি। 4G LTE এর স্পিড সাধারণত ৫ মেগাবিট পার সেকেন্ড থেকে ১৫ মেগাবিট পার সেকেন্ডে থাকে এবং পিক স্পিড প্রায় ৫০ মেগাবিট পার সেকেন্ড হয়।

এখন কিছু বাস্তব উদাহরণ দেখা যাক। উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর ফোরজি সার্ভিসে বেশ কিছু পার্থক্য দেখা যায়। ফোরজি নেটওয়ার্ক কতটা উন্নত তা পরীক্ষা করার জন্য মূলত দুটি ক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ করা হয় – নেটওয়ার্ক কভারেজ কত বেশি (4G Availability) এবং ইন্টারনেটের ডাউনলোড স্পিড কত। এই দুই ক্ষেত্র বিবেচনায় বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ভাল ফোরজি নেটওয়ার্ক রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া এবং সিঙ্গাপুরে।

লন্ডনভিত্তিক কোম্পানি ওপেন সিগনালের রিপোর্ট অনুযায়ী 4G Availability এর সূচকে দক্ষিণ কোরিয়া পৃথিবীতে প্রথম এবং ফোরজি স্পিডের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার 4G Availability প্রায় ৯৬.৩৮% এবং দ্বিতীয় স্থানে থাকা জাপানের 4G Availability ৯৩.৪৮% পাওয়া গেছে। এখানে 4G Availability বলতে দেশের সকল স্থান থেকে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় কিনা তা বোঝানো হয়নি বরং প্রতিটি ব্যবহারকারী কোন নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কে কতক্ষণ ধরে ফোরজি কানেকশন নিয়ে থাকতে পারবেন তা বোঝানো হয়েছে।

ফোরজি স্পিডের তালিকায় গড়ে ৪৫.৬২ মেগাবিট পার সেকেন্ড স্পিড নিয়ে শীর্ষস্থানে রয়েছে সিঙ্গাপুর। দ্বিতীয় স্থানে থাকা দক্ষিণ কোরিয়ার গড় স্পিড ৪৩.৪৬ মেগাবিট পার সেকেন্ড। হাঙ্গেরি (৪২.৬১ এমবিপিএস), নরওয়ে (৪১.৩৬ এমবিপিএস) এবং নেদারল্যান্ডস (৩৮.৩৬ এমবিপিএস) যথাক্রমে তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম স্থানে রয়েছে।

আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারত, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কায় ফোরজি নেটওয়ার্ক চালু হয়ে গেছে। শ্রীলঙ্কার ফোরজি সার্ভিস ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে, তবে ভারতের ফোরজি স্পিড বড় ধাক্কা খেয়েছে। ভারতের মত বিপুল জনসংখ্যার দেশে প্রচুর ফোরজি ব্যবহারকারী থাকলেও সেখানকার নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা যথেস্ট উন্নত না হওয়ায় গড় স্পিড কমে মাত্র ৫.১৪ এমবিপিএসে দাঁড়িয়েছে। ওপেন সিগনালের রিপোর্ট অনুযায়ী ভারত এবং কোস্টারিকার ফোরজি স্পিড পৃথিবীর সর্বনিম্ন (৫.১৪ এমবিপিএস)। শ্রীলঙ্কার গড় স্পিড ১০.৪২ এমবিপিএস এবং পাকিস্তানের গড় স্পিড ১১.৭১ এমবিপিএস। 4G Availability এর দিক থেকে শ্রীলঙ্কার অবস্থান পৃথিবীর মাঝে সর্বনিম্ন (৪০.১২%)। তবে এই সূচকে ভারত যথেষ্ট শক্তিশালী (৮১.৫৬%)। পাকিস্তানের 4G Availability শ্রীলঙ্কা থেকে ভাল (৫৩.৪৯%)।

5G: এখনোও এটা ডেভেলপমেন্ট প্রোসেসে রয়েছে, তবে আমেরিকাতে Verizon, T-Mobile, Sprint বর্তমানে কিছুদিন হলো কমার্শিয়ালি এনেছে 5G। কি কি বৈশিষ্ট্য নিয়ে 5G তৈরী হচ্ছে? আচ্ছা দেখা যাক?
• হাজার ইউজার একইসাথে একই জায়গায় যেন মিনিমাম 10mbps স্পিড পায়
• 1gbps গড় স্পিড
• simultaneous connections
• ৪জি’র চেয়ে কমপক্ষে ১০গুণ অধিকতর স্পিড হবে
• কভারেজ আরোও বিস্তৃত হবে
• ল্যাটেন্সি আরোও কমবে

6G: ৫জি-ই ঠিকমতো চালু হলো না, এরই মধ্যে স্যামসাং-সহ মিডিয়াটেক এবং আরোও অন্যান্যরা আগামীর জন্য এখনই 6G নিয়ে কাজ করা শুরু করেছে।

সবশেষে, যত যা-ই হোক, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখনোও 3G তেও যা হোক স্পিড তাও একটু পাওয়া যায়, কিন্তু তা-ই 4G নামে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নেটওয়ার্ক বারের পাশে 4G থাকলেও 3G-র মতো স্পিড নিয়ে দেশে আপনি 5G-র স্বপ্ন দেখতে থাকুন, আশা করি ২০২২ এর দিকে এসে যেতে পারে। তার আগে দরকার সাফিশিয়েন্ট পরিমাণ ৫জি স্মার্টফোন। দেখা যাক কতদিনে দেশে ডিজিটালাইজেশনের দিকে এগিয়ে 5G দেশে পৌছায়।

Avatar

Sajib Debnath

Test