স্মার্টফোন

মোবাইল ফোনের ডিসপ্লের বিবর্তন: যেভাবে এলো এখনকার স্মার্টফোনের স্ক্রিন

আজকাল আমাদের দিনের বেশিরভাগ সময়ই কাটে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে। পড়াশোনা থেকে বিনোদন, সবকিছুই হচ্ছে এখন আমাদের হাতের মোবাইলের স্ক্রিনে। তবে আমাদের হাতের ফোনটির স্ক্রিন কিন্তু সবসময় এমন ছিলো না। গত দুই দশকে অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে আমাদের সর্বসঙ্গী এই ফোনের স্ক্রিন। এই আর্টিকেলে আমরা দেখবো কিভাবে আস্তে আস্তে বহু বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে এসেছে আজকের এই স্মার্টফোনের স্ক্রিন।

প্রথম স্মার্টফোনের স্ক্রিন-

বিশ্বের প্রথম স্মার্টফোন বাজারে এনেছিলো আইবিএম। ১৯৯২ সালে তারা নিয়ে আসে আইবিএম সিমন কমিউনিকেটর নামক স্মার্টফোনটি। এতে ছিলো ১৬০x২৯৩ রেজ্যুলেশনের ৪.৫ ইঞ্চি x ১.৪ ইঞ্চি সাইজের সাদা-কালো স্ক্রিন। মজার বিষয় হলো, সিমন কমিউনিকেটরকেই প্রথম টাচস্ক্রিন সাপোর্টেড বাণিজ্যিক ফোন বলে অনেকে মনে করে থাকেন। এতে এখনকার স্যামসাং গ্যালাক্সি নোট সিরিজের ফোনগুলোর মতো স্টাইলাসও ছিলো।

আইবিএম সিমন কমিউনিকেটর

‘৯০ এর দশক থেকে ২০০০ এর আগ পর্যন্ত অবশ্য সাদা-কালো স্ক্রিনই বাজারে বেশি চলতো। এসব স্ক্রিনে বিভিন্ন রো আর কলামের সাহায্যে টেক্সট দেখা যেতো, যেটি দেখতে ছিলো ব্লকের মতো।

 

রঙিন স্ক্রিনের আবির্ভাব-

১৯৯৮ সালে বিশ্বের প্রথম কালার ডিসপ্লের ফোন বাজারে নিয়ে আসে সিমেন্স। তারা এই ফোনটির নাম দেয় সিমেন্স এস১০। এই ফোনটির স্ক্রিনে মাত্র ৪টি রঙ যথা – লাল, সবুজ, নীল এবং সাদা দেখা যেত। মূলত এই স্ক্রিনের কোনো প্র্যাক্টিকাল ইউজ না থাকায় সেসময় তেমন একটা জনপ্রিয়তা পায়নি ফোনটি।

সিমেন্স এস১০

এর ঠিক ২ বছর পর, ২০০০ সালে নোকিয়া নিয়ে আসে তাদের ৯২১০ কমিউনিকেটর। এতে ছিলো ৬৪০x২০০ পিক্সেলের একটি এলসিডি ডিসপ্লে। এটি দিয়ে সেসময় ইন্টারনেট ব্রাউজিং, গেম খেলা থেকে শুরু করে ৪০৯৬ প্যালেটের সাহায্যে ছবিও দেখা যেতো।

এরপর ২০০১ সালে বাজারে আসে এরিকসন টি৬৮। এটি সেসময় খুব ভালোই জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। ৬০০ ডলার প্রাইস ট্যাগের এই ফোনে ছিলো ১০১x৮০ রেজ্যুলেশনের ২৫৬ কালার সাপোর্টেড স্ক্রিন।

 

আইফোনঃ একটি নতুন অধ্যায়ঃ

২০০৭ সালের জুন মাসের ২৯ তারিখ। এ দিন স্টিভ জবসের কোম্পানি অ্যাপল উন্মোচন করে তাদের প্রথম আইফোন। মূলত আইফোনের দ্বারাই প্রযুক্তিজগতে সূচনা হয় এক নতুন দিগন্তের। এটির মাধ্যমেই মূলত শুরু হয় ফোনে ক্যাপাসিটিভ টাচ স্ক্রিনের ব্যবহার। উল্লেখ্য, ক্যাপাসিটিভ টাচ স্ক্রিনের আগে ব্যবহৃত হতো রেসিস্টিভ টাচ প্রযুক্তি, যেটি এখনকার ক্যাপাসিটিভ টাচ স্ক্রিনের মতো এতটা রেস্পন্সিভ ছিলো না। আর প্রথমবারের মতো গরিলা গ্লাসও ব্যবহার করা হয়েছিলো ২০০৭ সালের আইফোনে।

প্রথম জেনারেশনের আইফোন

 

প্রথম অ্যামোলেড স্ক্রিনের ফোনঃ

বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, প্রথম অ্যামলেড ডিসপ্লের ফোন কিন্তু স্যামসাং বানায়নি। জ্বি, ঠিকই শুনেছেন। ২০০৮ সালে উন্মোচিত নোকিয়া এন৯৫ তেই সর্বপ্রথম ব্যবহৃত হয় অ্যামোলেড ডিসপ্লে।

নোকিয়া এন৯৫

প্রথম এইচডি স্ক্রিনের ফোনঃ

২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্যামসাং নিয়ে আসে বিশ্বের প্রথম  এইচডি স্ক্রিনের ফোন, গ্যালাক্সি এস২ এইচডি এলটিই। এতে ছিলো ৪.৬৫ ইঞ্চির ১২৮০x৮০০ রেজ্যুলেশোন ও ৩১৬ পিপিআইয়ের এইচডি স্ক্রিন। তবে ফোনটি শুধুমাত্র কোরিয়ার বাজারেই বিক্রি করেছিলো স্যামসাং।

গ্যালাক্সি এস২ এইচডি এলটিই

ফ্যাবলেটের যুগঃ

২০১১ সালের অক্টোবর মাসে স্যামসাং উন্মোচন করে তাদের প্রথম গ্যালাক্সি নোট। সেসময় এটিতে ছিলো ৫.৩ ইঞ্চির একটি “বড়” (এখনকার হিসেবে ছোটই) ১২৮০x৮০০ রেজ্যুলেশনের স্ক্রিন। এছাড়াও এটির মাধ্যমেই স্যামসাং তাদের এস-পেন নামক স্টাইলাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় আমাদের। আর এর মাধ্যমেই শুরু হয় বড় স্ক্রিন ব্যবহারের এক নতুন ট্রেন্ড।

গ্যালাক্সি নোট

প্রথম ৩ডি ডিসপ্লেঃ

স্মার্টফোনে ৩ডি ডিসপ্লের ব্যবহারের ইতিহাস অত্যন্ত ক্ষুদ্র। এখন পর্যন্ত মাত্র ২টি ফোনে ব্যবহৃত হয়েছে এই ৩ডি ডিসপ্লে। ফোন দুটি হচ্ছে ২০১১ সালে উন্মোচিত হওয়া এলজি অপটিমাস ৩ডি এবং এইচটিসি ইভো ৩ডি। অবশ্য এলজি অপটিমাস ৩ডি এইচটিসি ইভো ৩ডির সপ্তাহখানেক আগে উন্মোচিত হয়েছিলো। আর প্রথম ফোনে ৩ডি ডিসপ্লে ব্যবহার করা হয় ২০০২ সালে, শার্পের মোভা এসএইচ২৫১ আইএস’এ।

এলজি অপ্টিমাস ৩ডি

প্রথম ফুল এইচডি ডিসপ্লেঃ

২০১২ সালে উন্মোচিত হওয়া এইচটিসি জে বাটারফ্লাইয়ে ব্যবহৃত হয় ১০৮০পি ডিসপ্লে।

HTC J Butterfly: Price, specs and best deals
এইচটিসি জে বাটারফ্লাই

 

প্রথম QHD (2K) ডিসপ্লেঃ

vivo Xplay3S Specs - Technopat Database
ভিভো এক্স প্লে ৩ এস

২০১৩ সালে উন্মোচিত হওয়া ভিভো এক্স প্লে ৩এস’এ ব্যবহৃত হয় QHD (১৪৪০পি) ডিসপ্লে।

 

কার্ভড স্ক্রিনঃ একটি (অ)প্রয়োজনীয় জিনিস?

কার্ভড স্ক্রিন নিয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অনেকেরই এটি পছন্দ, আবার অনেকেই মিসটাচ ইস্যু এবং গ্লাস প্রটেক্টর লাগানো নিয়ে সমস্যায় পড়েন দেখে এটিকে ঘৃণা করেন। এই কার্ভড ডিসপ্লে কিন্তু বাজারে প্রথম আনে স্যামসাং। ২০১৩ সালে তারা তাদের গ্যাল্যাক্সি রাউন্ডে প্রথম ব্যবহার করে কার্ভড ডিসপ্লে। এরপর ২০১৪ সালের গ্যালাক্সি নোট এজ এবং এবং ২০১৫ সালের গ্যালাক্সি এস৬ এজের মাধ্যমে ফ্ল্যাগশিপ মার্কেটে কার্ভড ডিসপ্লে ব্যবহারের ট্রেন্ড চালু করে।

Samsung Galaxy Round G910S pictures, official photos
গ্যালাক্সি রাউন্ড

 

প্রথম বেজেললেস ডিসপ্লেঃ
বছর তিনেক আগেও আমাদের সবারই হাতে ছিলো ১৬ঃ৯ অ্যাসপেক্ট রেশিওর স্ক্রিনের ফোন। আর এখন বাজেট রেঞ্জ থেকে শুরু করে ফ্ল্যাগশিপ, সব ফোনই বেজেললেস। ২০১৬ সালের শাওমি মি মিক্স এবং ২০১৭ সালের স্যামসাং গ্যালাক্সি এস৮ দিয়ে এটি জনপ্রিয়তা পেলেও বেজেললেস স্ক্রিনের প্রথম ইমপ্লিমেন্টেশন করে শার্প। ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে উন্মোচিত হওয়া শার্প অ্যাকুয়স ক্রিস্টালে বেজেললেস স্ক্রিন দেয়ার চেষ্টা করে।

Hands on: Sharp Aquos Crystal review | TechRadar
শার্প অ্যাকুয়স ক্রিস্টাল। ছবিঃ টেকরাডার

 

প্রথম ৪কে স্ক্রিনের ফোনঃ

২০১৫ সালের সনি জেড৫ প্রিমিয়ামে প্রথম ব্যবহৃত হয় ৪কে ডিসপ্লে।

Sony Xperia Z5 Premium pictures, official photos
সনি জেড ৫ প্রিমিয়াম

 

প্রথম এইচডিআর স্ক্রিনের ফোনঃ

২০১৬ সালে সনি এক্সপেরিয়া এক্সে প্রথম ব্যবহৃত হয় এইচডিআর সাপোর্টেড ডিসপ্লে। আর ২০১৭ সালের এলজি জি৬ এ প্রথম ব্যবহৃত হয় ডলবি ভিশন এইচডিআর।

Sony Xperia X Price in India, Specifications, Comparison (7th March 2021)
সনি এক্সপেরিয়া এক্স

 

হাইয়ার রিফ্রেশ রেটঃ একটি মার্কেটিং স্টান্ট?

এই ২০২১ সালে এসে মোটামুটি বাজেট রেঞ্জ থেকে ফ্ল্যাগশীপ, সব ডিভাইসেই ব্যবহার করা হচ্ছে হাইইয়ার রিফ্রেশ রেট ডিসপ্লে। অনেক কোম্পানি তো ফোনে ভালো চিপসেট না দিয়ে বেশি র‍্যাম আর ৭২০পি ডিসপ্লের সাথে হাইয়ার রিফ্রেশ রেটের মুলো ধরিয়ে দিচ্ছে। আপাত দৃষ্টিতে এই হাইয়ার রিফ্রেশ রেটের ব্যবহার নতুন মনে হলেও এটি প্রথম ব্যবহার করা হয় ৬ বছর আগে, সেই ২০১৫ সালে। ২০১৫ সালে উন্মোচিত হওয়া শার্প অ্যাকুয়স জেটা এসএইচ-০১এইচে প্রথম ব্যবহার করা হয় ১২০ হার্জের ডিসপ্লে। এরপর ২০১৭ সালের রেজর ফোনের মাধ্যমে এই ফিচারটি জনপ্রিয়তা পায়। তারপর ২০১৮ সালের আসুস রগ ফোনে প্রথম ব্যবহৃত হয় ৯০ হার্জের ডিসপ্লে। আর ২০২০ সালের নুবিয়া রেড ম্যাজিক ৫জি তে প্রথমবার ব্যবহৃত হয় ১৪৪ হার্জের ডিসপ্লে। একই বছর শার্প তাদের অ্যাকুয়স জিরো ২ এ ব্যবহার করে ২৪০ হার্জের ডিসপ্লে।

Sharp Aquos Zeta SH-01H - Slightly Used
শার্প অ্যাকুয়স জেটা এসএইচ-০১ এইচ

প্রথম নচ এবং পাঞ্চ হোল ডিসপ্লের ফোনঃ

২০১৭ সালের আইফোন ১০ এর নচ ব্যবহারের পরই সবাই ফোনে নচ ব্যবহার শুরু করে। যদিও প্রথম নচওয়ালা ফোন বাজারে আনে অ্যান্ড্রয়েডের জনক এন্ড্রু রুবিনের কোম্পানি এসেনশিয়াল (কোম্পানিটি এখন দেউলিয়া হয়ে ওয়ানপ্লাসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা কার্ল পেইয়ের নতুন কোম্পানি নাথিংয়ের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে)। ২০১৭ সালেই তারা তাদের এসেনশিয়াল ফোনে প্রথম নচ ইমপ্লিমেন্ট করে। আর প্রথম হোল পাঞ্চ ডিসপ্লে ব্যবহার করে হুয়াওয়ে, তাদের নোভা ৪ ফোনে।

Amazon.com: Essential Phone in Black Moon – 128 GB Unlocked Titanium and Ceramic phone with Edge-to-Edge Display
এসেনশিয়াল ফোন ১

প্রথম ইন-ডিসপ্লে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরঃ
২০১৮ সালের ভিভো এক্স২১ ইউডি’তে প্রথম ব্যবহার করা হয় ইন-ডিসপ্লে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর।

Vivo X21 UD Price in India, Specifications, Comparison (7th March 2021)
ভিভো এক্স২১ ইউডি

 

ফোল্ডেবল ডিসপ্লেঃ স্মার্টফোনের ভবিষ্যত?

ফোল্ডেবল ডিসপ্লে এখনো উদীয়মান নতুন প্রযুক্তি। এখনো অতটা এভেইলেবল না এই ডিসপ্লে টেকনোলজি। ২০১৮ সালে প্রথম রয়োল ফ্লেক্সপাইয়ে ব্যবহার করা হয় এই প্রযুক্তি। তবে ফ্লেক্সপাইয়ে ব্যবহার করা হয়েছিলো প্লাস্টিকের তৈরি ফোল্ডেবল স্ক্রিন। আর ২০২০ সালে স্যামসাং তাদের গ্যালাক্সি জেড ফ্লিপে ব্যবহার করে কাঁচের তৈরি ফোল্ডেবল স্ক্রিন। আর এবছরের CES এ এলজি ঘোষণা দেয় যে তারা রোলএবল ডিসপ্লের ফোন বাজারে আনছে।

Reviews of the Royole FlexPai are coming in - first but flawed foldable phone - NotebookCheck.net News
রয়োল ফ্লেক্সপাই

 

আর্টিকেলটি ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে পারেন। এছাড়াও জয়েন করতে পারেন এটিসির ফেসবুক গ্রুপ, পেজ এবং ইন্সটাগ্রামে

Avatar

Tahsinul Mohsin

playing with tech is the best way to gather knowledge