অন্যান্য

ই-বুক রিডারের আদ্যোপান্ত

ই-বুক রিডার নাম শুনলেই মনে আসে, একটা আস্ত বইয়ের লাইব্রেরীর একটা ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের ভিতর বসবাস। এই ই-বুক নামকরণ হলো কিভাবে, কেনো হলো ই-বুক (কেনো এফ-বুক হলো না), কবে থেকে এসবের শুরু; আসুন সবকিছু নিয়ে একটু খোশগল্পে মাতি আগামী ৫ মিনিট!

গল্পটা শুরু ২০০০ সাল এর দিকে, যখন কিনা আমেরিকাতে ই-বুক এবং ই-বুক রিডার দুটোই প্রচলন ঘটে ব্যাপকভাবে যা কিনা ২০১০ এর দিকে হার্ড-কপি বইয়ের সিংহভাগ মার্কেট শেয়ার দখল করে নেয়। কিন্তু কেন? কেন মানুষ ই-বুকের দিকে ঝুঁকেছে?

প্রধান কয়েকটি কারন যদি উল্লেখ করতে হয়, তাহলে-

কম দামঃ একটা স্মার্টফোন কিংবা ট্যাবলেট পিসির চেয়ে অনেকাংশেই কম দামী হয়ে থাকে ই-বুক রিডার।

আরামদায়কঃ ই-বুক রিডারের ই-ইঙ্ক স্ক্রিন বই পড়ার জন্য আরামদায়ক এবং চোখের জন্য তুলনামূলক কম ক্ষতিকর, কারণ এতে কোনো ব্লু-লাইট থাকে না।

বিশাল লাইব্রেরী : বিশেষত ইংরেজী, এছাড়া অন্যান্য ভাষাতেও ইলেক্ট্রনিক বইয়ের এক বিশাল সংগ্রহশালা রয়েছে ইন্টারনেটে।

কমেন্ট (নোট) : আপনি চাইলে যেকোনো ই-বুকের যেকোনো লাইনে যেকোনো পেইজে কোনো কিছু মার্ক করে রাখতে পারবেন, চাইলে নিজের কোনো মন্তব্যও জুড়ে দিতে পারবেন 

ই-বুককে কতো নামে ডাকা হয় জানেন ? কম করে হলেও ৭ ভাবে রেকগনাইজ করা হয় একে যেমন- “ebook”, “eBook”, ” Ebook”, “e-Book”, ” e-Journal”, “Digital Book”।

ছোট্ট একটা পরিসংখ্যান দেখাই চলুন ! মাত্র ২০১৩ তেই আমেরিকাতে ই-বুক ছিলো মোট বইয়ের মার্কেট শেয়ারের ২৩%, আর তখন আমেরিকানদের হাতে ছিলো ৩০% ই-বুক রিডার। আর ২০১৪ তে সেই সংখ্যা বেড়েছে- ২৮% ই-বুকের বিপরীতে ৫০% ই-বুক রিডার হাতে চলে আসে আমেরিকানদের হাতে। জনপ্রিয়তার অংকটা জাপানের ড্রেইনের মতো পরিষ্কার!

আচ্ছা! কিভাবে এই ই-বুকের যাত্রা শুরু হলো ? কিভাবেই বা এই কন্সেপ্টটা মার্কেটে এলো, কিভাবে কি হলো- আচ্ছা সবই বলি এবার। ই-বুক তৈরীর ইতিহাসটা একটু ঘোলাটে। কারন কোনো একজনকে ই-বুক তৈরীর কারিগর বলা যায় না। কয়েকজনের নাম উল্লেখযোগ্য-

Roberto Busa: একজন ইটালিয়ান খ্রিষ্টান পুরোহিত, যিনি কি না “index thomisticus” নামক একটা ইলেক্ট্রনিক বই লিখেছিলেন ১৯৪৬ থেকে ১৯৭০ সাল অব্দি, যা পরর্তীতে ডিস্ট্রিবিউট হয়েছিলো ১৯৮৯ তে, আর প্রথমবার অনলাইনে এসেছিলো ২০০৫ সালে।

Angela Ruiz Robes: পেশায় একজন শিক্ষিকা, যার অবস্থান ছিলো স্পেইনের ফেরোলে। তিনি সবসময় চেয়েছিলেন স্কুল-কলেজে যেন কম কম বই বহন করা লাগে, আর তাই শুরুটা করেছিলেন “Enciclopedia Mechanica aka. Mechanical Encyclopedia” ইলেক্ট্রনিক বই লিখে।

Douglas Engelbart: ১৯৬০ সালে Stanford Research Institute (SRI) তে “HyperText Editing” আর “FRESS Project” এর আন্ডারে ই-বুকের আরোও উন্নতি সাধনের জন্য কাজ করেন, তা পরবর্তীতে এগিয়ে নিয়ে যান Adreis Van Dam

Michael S. Hart: ভদ্রলোক যা করছেন তা হলো আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ই-বুক আকারে প্রকাশ করেন ১৯৭১ সালে।

Paul Baim: ১৯৯৩ সালে HyperCard নামক একধরনের ই-বুক রিডার নিয়ে আসেন, যাতে প্রথমবার “eBook” কথাটা ব্যবহৃত হয়। এই ডিভাইসের বৈশিষ্ট্য ছিলো আপনি যেখানে পড়ছিলেন, সেখানেই আপনাকে পরবর্তীতে ফিরিয়ে আনতে পারতো! ২৭ বছর আগে এটাও এক যুগান্তকারি পদক্ষেপ ছিলো।

আচ্ছা, ই-বুক তো নানারকমেরই হয়! অর্থাৎ ফরম্যাট তো হরেক রকম! একবার নামগুলো জেনে নিলে কেমন হয় ?

Adobe PDF: সবথেকে বহুল ব্যবহৃত ই-বুক ফরম্যাট বর্তমান বিশ্বে, হয়তো আপনিও কখনোও না কখনোও PDF পড়েছেন।

Text Encoding Initiative (TEI): ১৯৯০ তে মার্কেটে এসেছিলো ফরম্যাটটি, যা জনপ্রিয়তা না পেলেও অন্যদের পথ দেখিয়েছিলো অবশ্যই।

Open eBook: ৯০ এর দশকে এক নতুন ধরনের ফরম্যাট মার্কেটে আসে যাতে ছিলো xHTML আর CSS ল্যাঙ্গুয়েজ, যা পরবর্তীতে ePUB নামে মার্কেটে রয়ে গেছে।

আর ডিভাইসের সাথে সাথে নতুন নতুন অনেক ফরম্যাটও মার্কেটে রাজত্ব ফলিয়েছে-

Amazon Kindle: সবথেকে ব্যাপকভাবে বিক্রিত ই-বুক রিডার, যার জন্য আলাদা ফরম্যাটের (AZW, AZW3, KF8, non-DRM mobi, PDF, PRC, TXT) ই-বুক প্রকাশিত হয়ে থাকে। Kindle এর পরেই এমাজন এর জনপ্রিয় প্রোডাক্ট আরেকটি রয়েছে, নাম Fire ট্যাবলেট!

Barnes & Noble Nook: ট্যাবলেট ধরনের মাল্টিপারপজ এই ই-বুক রিডারের ফরম্যাট দেখা যায় ePUB, PDF।

Apple iPad: অ্যাপেল মানেই তো আলাদা কিছু, তাদের ফরম্যাটও ভিন্ন (ePUB, IBA – MultiTouch books made via iBooks Author, PDF)।

Sony Reader : একটু বন্ধুসুলভ আচরনের SONY কিন্তু বেশ কয়েকটি চলতি ফরম্যাটই সাপোর্ট করে (ePUB, PDF, TXT, RTF, DOC, BBeB)।

Kobo eReader & Kobo Arc: ePUB আর PDF সহ আরও সাপোর্টেড এতে TXT, RTF, HTML, CBR, CBZ (comic)।

Android Devices with Google Play Books: এইতো, আমাদের কাঙ্খিত প্রোডাক্ট, কিন্তু অতটাও জনপ্রিয় নয় এইটা! শুধুমাত্র ePUB আর PDF সাপোর্টেড।

PocketBook Reader আর PocketBook Touch: ডজনখানেক ফরম্যাটে সাপোর্টেড! শুনবেন ? ePUB, ePUB DRM, PDF, PDF DRM, FB2, FB2.ZIP, TXT, DJVU, HTM, HTML, DOC, DOCx, RTF, CHM, TCR, PRC, PRC mobi!

জুলাই ২০১০ এ Amazon Kindle ই-বুক রিডার বিক্রি শুরু করে, জানতেন এটা? তখন সেই বছরেই অ্যামাজনে প্রতি ১০০ হার্ড কপি বই বিক্রির বিপরীতে ১৪০ টি করে Kindle বিক্রি হচ্ছিলো। আর সেটা জানুয়ারী ২০১১ তে হার্ডকপি বিক্রিতে Kindle ছাড়িয়ে যায় বহুদূর। আমেরিকান পাবলিশিং অ্যাসোশিয়েশন অনুসারে আমেরিকাতে মোট বই বিক্রির ৮.৫% দখল করে আছে ই-বুক।

যদিও বাংলাদেশে এর তেমন ব্যবহার নেই, তারপরও এর অ্যাডভ্যান্টেজেজ গুলো তো অস্বীকার করা যায় না ! একটা এভারেজ বইয়ের সাইজের ই-বুক রিডারে আপনি চাইলে লাখ লাখ বই স্টোর করে রাখতে পারবেন। যা কিনা একজন বইপ্রেমির জন্য আজীবনের খুশির খোরাক। আর তাছাড়া আপনি অল্প আলোতেও খুব ভালোভাবে পড়তে পারবেন। ব্লু লাইট না থাকায় চোখের ক্ষতি করবে না। ফন্ট ছোট-বড় করে নিতে পারবেন। এমনকি বই পড়েও দেয় অনেক ই-বুক রিডার! সার্চ অপশন আপনার সময় বাঁচাবে। ডিকশিনারি থাকছে এতে। যা আপনার পড়ার গতি আরোও বাড়িয়ে তুলবে। একটা সাধারন ই-বুক রিডার বানাতে যা খরচ হয়ে থাকে, একটা সাধারণ বই ছাপানোর খরচের সমান। অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও কম। কিন্তু সুবিধা হচ্ছে আপনি লাখ লাখ পাতা কাগজ বাঁচাতে পারলেন। আর বই গুছিয়ে রাখবার জন্য ই-বুক রিডার দারুণ অপশন। রিডিং লোকেশন, হাইলাইটস, বুকমার্ক ইত্যাদি নানানরকম ফিচারে ঠাসা ই-বুক রিডার।

আর যদি ডিজঅ্যাডভ্যান্টেজেজ কথা বলি, তাহলে তো প্রথমেই আসবে প্রাইভেসি ইস্যু। আপনি যদি এমাজনের Kindle পড়েন, তাহলে এমাজন জানবে যে আপনি কে, কোথায় থাকেন, কি পড়ছেন, কোন পাতা পড়ছেন, কোন পাতা কতক্ষণ ধরে পড়েছেন, আপনি কোন লাইন বা প্যাসেজ হাইলাইট করেছেন ইত্যাদি। তাছাড়া এখনোও বড় এক সংখ্যক পাঠকেরা প্রিন্টেড্ মিডিয়াতেই বিশ্বাসী এবং স্বাচ্ছন্দ্যে হার্ড কপিই পড়তে চান তারা। এছাড়া Kobo-র এক রিসার্চে উঠে এসেছে যে 60% ই-বুক ক্রেতা শেষ অব্দি বইটি কখনোও পড়েন নি।

এ বিষয়ে Joe Qeenan লিখেছেন, ই-বুক হলো তাদের জন্য যারা কিনা এতে থাকা তথ্যের কদর করে থাকে, বা যারা রাস্তায় চলতে চলতে পড়তে পছন্দ করেন, যা দৃষ্টিজনিত কোনো সমস্যা আছে, বা অন্যকে জানতে দিতে চান না যে তিনি নিজে কি পড়ছেন, বা যাদের ব্যাগে জায়গা কম একাধিক বই ক্যারি করার জন্য। তবে যারা হার্ড কপি বইয়ের সাথেই বেড়ে উঠেছেন, এবং যাদের কাছে বই পড়ার জন্য হার্ড কপি বই একটা পরিবেশ তৈরী করে তোলে, তাদের জন্য ই-বুক একদমই ইউজলেস।

বই একটা আবেগের নাম। একটা ভরসার জায়গা। বই- যা কিনা আমরা ধরতে পারি, ছুঁতে পারি। নতুন বইয়ের একটা আলাদা সুঘ্রাণ থাকে। টাকা দিয়ে একটা বই কিনেছি, হাতে বইটা থাকবে- এটাই তো ম্যাক্সিমাম পাঠক চাইবেন। কিন্তু প্রযুক্তির আধুনিকায়নের সাথে সাথে ই-বুকের চাহিদাও বেড়েছে অনেকাংশে। আপনি কি ভাবছেন ? জানাতে ভুলবেন না।

Avatar

Sajib Debnath

Test