অন্যান্য

মিডিয়াটেক প্রসেসরের ইতিকথা

মিডিয়াটেক যাকে অনেকে আদর করে ডাকে “মদনটেক”। এটি একটি ‘প্রসেসর’ বা ‘SOC’ (System On Chip) নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান। আধুনিক মোবাইল প্রসেসরে শুধু নিয়ন্ত্রণকারী CPU (Central Processing Unit) থাকে না, এর সাথে গেমিং-এর জন্য আলাদা GPU (Graphics Processing Unit), কল কানেক্টিভিটির জন্য সেলুলার মোডেম, ইন্টারনেটের জন্য WIFI, 4G থেকে শুরু করে তুখোড় 5G মোডেম যুক্ত হয়। এছাড়াও ব্লুটুথ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা Artificial Intelligence (AI) এর জন্য আলাদা প্রসেসিং ইউনিট নিয়ে জম্পেশ একটা কম্বিনেশন বা Integrated Circuit তৈরি করা হয়। সব সমস্যার সমাধান এভাবে কয়েক সেন্টিমিটারের একটি চিপের মধ্যে এঁটে দেয়া হয়। নেহায়েত শখের বশে নয়, বরং কম জায়গায় বেশি কাজ করার জন্য এভাবে ডিজাইন করা হয় চিপগুলো। ফলে ব্যাটারি বা পাওয়ার লাগে কম কিন্তু কার্যক্ষমতায় আপোষ করা হয় না। প্রসেসর চিপের গঠনশৈলী এভাবে দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে ২৮ ন্যানোমিটার থেকে কমতে কমতে ৫ ন্যানোমিটার পর্যন্ত নিয়ে আসতে কিছুটা সক্ষম, কিছুটা বাধ্য হয়েছেন বিশ্বের বাঘা বাঘা কোম্পানির বেতনভুক্ত চিপ ডিজাইনাররা। এরকমই একটি তাইওয়ানের প্রতিষ্ঠান মিডিয়াটেক, দেশটির আরেকটি কোম্পানির সাথেও আমরা কমবেশি ভালোই পরিচিত, যার নাম আসুস (ASUS)!

কোয়ালিটি নিয়ে, সক্ষমতা নিয়ে তাইওয়ানের এই SOC নির্মাতা কোম্পানি কখনোই খুব পিছিয়ে ছিল না, বরং সময়ের সাথে নিজেদের কর্মক্ষমতা বাড়িয়েছে, প্রসেসরের বিবর্তনে অংশ নিয়ে হয়েছে বিশ্বসেরা। শুরুর দিকে ইউনাইটেড মাইক্রো ইলেকট্রনিক্স (UMC) এর অন্তর্ভুক্ত একটি বাসাবাড়ির বিনোদন পণ্যের চিপ নির্মাণ বিভাগ ছিল মিডিয়াটেক । ১৯৯৭ সালে আলাদা হবার পর, ডিভিডি, ডিজিটাল টিভির হাত ধরে মোবাইল বাজারে প্রবেশ করে ২০০৪ সালের দিকে। এক্ষেত্রে বড় বড় কোম্পানির দামি দামি ফোনের ভিড়ে একটি সাশ্রয়ী সমাধান দেওয়ার মাধ্যমে, ছোট ও মাঝারি বিভিন্ন ফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে আকৃষ্ট করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালে প্রতিদ্বন্দ্বী এমস্টার সেমিকন্ডাক্টর ইনকর্পোরেটকে অধিগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের পথ আরও মসৃণ করে তোলে ।

২০১৩ সালের জুলাইয়ে ও নভেম্বরে পরপর, নতুন উদ্ভাবিত এআরএম বিগ লিটল প্রযুক্তির মাল্টি-প্রসেসর সক্ষমতার ১ম প্রসেসর MT8135 ও MT6592 অক্টাকোর (৮ টি কোর বা অংশ) প্রযুক্তির SOC বাজারে নিয়ে আসে তারা। পরের বছর ফেব্রুয়ারিতে ব্লুটুথ, ৮০২.১১/এ/বি/জি/এন/এসি ওয়াইফাই, এএনটি+, জিপিএস এবং এফ.এম. রেডিও এর মত নতুন নতুন সুবিধাযুক্ত 6330 বাজারে বের হয় । এরপর তারা ২০১৫ সালে ইন্ডাস্ট্রির ১ম ট্রাই-ক্লাস্টার ও ১০টি কোরের সিপিইউ ক্ষমতার Helio X20 উন্মোচন করে; যার মধ্যে সিডিএমএ২০০০ এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মিডিয়াটেকের ১ম সন্নিবেশিত (integrated) মোডেম ব্যবহার করা হয়।  ট্রাই-ক্লাস্টার প্রযুক্তিটি পরবর্তীতে হুয়াওয়ে, স্যামসাং ও কোয়ালকমের চিপের ডিজাইনেও অনুসরণ করা হয়। মোবাইলের পাশাপাশি অ্যামাজনের ফায়ার এইচডি ট্যাবলেটে MT8135, গুগল ও সনির অ্যান্ড্রয়েড টিভিতে MT5595 গুরুত্ব পায়।

অন্যদিকে মোবাইল প্রসেসরের মার্কেটে শুরু থেকেই একচেটিয়া রাজত্ব করে আসছে কোয়ালকম। আর তাদের প্রচলিত স্ন্যাপড্রাগন প্রসেসরের নাম শোনেন নি এরকম মোবাইল ব্যবহারকারী খুব বেশি নয়। আপনার নিজের হাতের মোবাইল হ্যান্ডসেটটির হৃদয়ে যে তাই খুব সম্ভবত স্ন্যাপড্রাগন এর 4/6/7/8 সিরিজের কোনো সুখ্যাত প্রসেসর তা মোটামুটি অনুমেয়; আদতে স্ন্যাপড্রাগন এর সব প্রসেসরই বিশেষ কারণে বিখ্যাত। কোয়ালকমকে প্রথম দিক থেকেই পিসি জগতের নামকরা “ইন্টেল থেকে শুরু করে স্যামসাং এর এক্সিনোজ বা হুয়াওয়ের কিরিন” এমন বহু কোম্পানি, বিভিন্ন সময়ে কাবু করতে চেয়েছে। কিন্তু এত এত কোম্পানির ভিড়ে হাল ধরে সবচেয়ে বেশি সাফল্যের দেখা পেয়েছে মিডিয়াটেক। তাই তো 2020 এর চতুর্থ প্রান্তিকে মিডিয়াটেকের প্রসেসরের মার্কেট শেয়ার খোদ স্ন্যাপড্রাগনকেও ছাড়িয়ে গেছে।

মিডিয়াটেকের এই আন্ডারডগ থেকে সফল প্রসেসর নির্মাতা হয়ে ওঠার এই ইতিহাস যেমন এক যুগেরও বেশি সময়ের, তেমনি বেশ রোমাঞ্চকর আর সাড়া জাগানিয়া।

শুধু তাই নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে প্রসেসরের বিবর্তনের বাকি গল্প। এখানে বলা বাহূল্যঃ বাজারে রাজত্বকারী অপারেটিং সিস্টেম অ্যান্ড্রয়েডের মালিক গুগলের ফোনেও প্রসেসর হিসেবে স্ন্যাপড্রাগনের প্রসেসর বরাবরই স্থান পায়। এতে করে পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে খুব বেশি পার্থক্য না থাকলেও স্ন্যাপড্রাগনের প্রসেসরগুলো অ্যান্ড্রয়েডের ক্ষেত্রে একটু বেশি ভালো কাজ করে বা বেটার অপটিমাইজড। যদিও স্ন্যাপড্রাগনের নাম ব্যবহার করতেও একটা আলাদা লাইসেন্স ফি দিতে হয়, (ভাবই আলাদা, তাই না!) যেখানেও ব্যাতিক্রম মিডিয়াটেক; তবুও স্ন্যাপড্রাগনের চাহিদা আর জনপ্রিয়তা এবং সেই সাথে দামও আকাশচুম্বী।

মিডিয়াটেক তাদের যাত্রা শুরু করে মোবাইল বাজারে তাদের 6 সিরিজের প্রসেসর দিয়ে। ২০১৩ সালের আগ পর্যন্ত মিডিয়াটেকের 6 সিরিজের প্রসেসরগুলো জিপিউ-ই ছিল না। ছিল সাধারণ সেলুলার কানেকশন। আস্তে আস্তে প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটে। জনপ্রিয় 65 সিরিজেই পূর্বের ৮/১৬ বিটের চেয়ে ৩২ বিটের মেমোরি প্রযুক্তি সহজলভ্য হয়ে উঠে আর Helio A, P এবং G সিরিজে ৬৪ বিট তো সময়ের দাবী। এর মধ্যে MT6737 ও MT6739 এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। আমাদের Symphony, Walton এর মত বহু ব্র্যান্ডের ফোন অঞ্চলভেদে রিব্র্যান্ডেড বা হালকা নাম, লোগো পরিবর্তন করে ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। এর পিছনে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়- স্ন্যাপড্রাগনের কম বাজেটের 4 সিরিজের তুলনায় মানে ও দামে কিছুটা ছাড় দিয়েই সেসময়ের ৩জি থেকে ৪জি স্মার্টফোনে উন্নীত হওয়ার সুবিধা দেওয়া যেত।

জিএসএম, ইউএমটিএস, জিপিআরএস, এইচএসপিএ+ , এইচএসপিইউএ, টিডি-এসসিডিএমএ, এলটিই ক্যাট ৪  ইত্যাদি হরেক নেটওয়ার্ক কনফিগারেশন সাধ আর সাধ্যের মধ্যে ব্যালান্স করেই পাওয়া যেতে শুরু করে। ভালো করে বললে মিডিয়াটেকের প্রসেসরের বিবর্তনে ভারতকেন্দ্রিক এশিয়ার এই অঞ্চলের সম্ভাবনাময় ও দ্রুত বর্ধনশীল মোবাইল বাজার বেশ ভালো ভূমিকা পালন করে।  এর পরেও প্রিমিয়াম প্রসেসর হিসেবে স্ন্যাপড্রাগনের আলাদা আলাদা কদর বরাবরই অব্যাহত ছিল। কিন্তু একের পর এক চেষ্টা চালিয়ে গেছে মিডিয়াটেক। এসময় স্ন্যাপড্রাগনের ফ্ল্যাগশিপের সাথে পাল্লা দিতে আসে মিডিয়াটেক Helio X সিরিজ। Helio সিরিজ এখন পর্যন্ত জনপ্রিয় এবং স্ন্যাপড্রাগনের সাথে ভালো পাল্লা দেয়া প্রসেসর। প্রথমদিককার 28 nm এর প্রসেসরগুলো দামে কম হলেও বেশিদিন টিকতো না, দ্রুত গরম হয়ে যাওয়া বা বেশি ব্যাটারি পাওয়ার খরচ করার মত সমস্যাযুক্ত ছিল। ধীরে ধীরে Helio X20, X25, X30 প্রসেসরের মাধ্যমে মিডিয়াটেক ও প্রসেসর জগত, প্রথাগত 20/28 nm উৎপাদন কৌশল থেকে 10nm এ পদার্পণ করে।

তবে Helio P সিরিজের P60,P70,P90 দিয়ে পূর্বের পারফরম্যান্সে ঘাটতি আর উত্তপ্ত হবার সমস্যা অনেকাংশে হ্রাস করে বেশ সাড়া ফেলে দেয় মিডিয়াটেক। পাশাপাশি Nokia, Xiaomi, Realme এর মত ব্র্যান্ডের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়। সমান তালে A সিরিজের A22, A25 এবং P সিরিজের P22, P23, P35 ইত্যাদি প্রসেসর নিয়ে মিডিয়াটেক মধ্যম আর কম বাজেটের বাজার বাজিমাত করার লক্ষ্যে অগ্রসর হয়। স্ন্যাপড্রাগনের সমকক্ষ 4, 6 এর পর 7 সিরিজকে লক্ষ্য বানায় মিডিয়াটেক। ১৯ এর শেষ থেকে শুরু করে ২০ পর্যন্ত এবং এখনও ভালো পারফরম্যান্সের জন্য বাজারে দাপট বজায় রাখতে পেরেছে G সিরিজ। কম দামে বেশি পারফরম্যান্স কামনাকারী গোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে নির্মিত এই G সিরিজের সাফল্যে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করে কোম্পানির নতুন হাইপারইঞ্জিন টেকনোলজি যার সর্বশেষ ভার্সন ৩.০। ফলে প্রতিপক্ষের তুলনায় GPU ক্ষমতা বেশ ভালোরকম বুস্ট পায়, এর সাথে আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স বা APU কার্যকারিতা মিলে প্রায় সকল মোবাইল নির্মাতার কাছে ভরসার প্রতীক এখন G সিরিজ। একটু কম দামের G35 থেকে শুরু করে G70, G80, G85,G90T এবং সর্বোচ্চ 900 মেগাহার্টজের GPU সংবলিত G95 প্রসেসরগুলো মিডিয়াটেকের পুনরুত্থান এবং টিকে থাকার লড়াইয়ে সাফল্যের জয়গান গেয়ে যায়। পূর্বের Mali জিপিইউ দিয়েই স্ন্যাপড্রাগনের অনন্য Adreno এর ঘাড়েও নিঃশ্বাসের আভাস দিয়ে যায় মিডিয়াটেক!

২০২০ এ করোনা মহামারির পাশাপাশি আরেকটি বিষয় বেশ প্রসিদ্ধ হয়ে উঠে যে, পঞ্চম প্রজন্মের (৫জি) মোবাইলে নেটওয়ার্কিং সুবিধার জন্য ফোনে যে আলাদা মোডেমযুক্ত প্রসেসর পাওয়া যায় তা দামে বেশ চড়া! ফলে স্ন্যাপড্রাগনে প্রসেসরযুক্ত ফোনের দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায় বছরের শুরু থেকেই। এর ফলে LG, Google এর মত প্রতিষ্ঠান সর্বোন্নত ফ্ল্যাগশিপ স্ন্যাপড্রাগন 865 এর পরিবর্তে 765 কে বেছে নেয়। এমতাবস্থায় 8 সিরিজের কাছাকাছি সামর্থ্য নিয়েও 7 সিরিজের সাথে লড়াইতে বাধ্য হয় মিডিয়াটেক। 5G এর জন্য উপযুক্ত, উন্নত প্রযুক্তির Dimensity সিরিজের প্রসেসর দিয়ে চীনে তো বটেই; এশিয়া ছাড়িয়ে ইউরোপ, আমেরিকাতেও তাক লাগানোর মত অসাধ্য সাধন করে কোম্পানিটি। ফলশ্রুতিতে কোয়ালকম এর 5G সিরিজের দাপটের কারণে যেখানে Flagship স্মার্টফোনের দাম উত্তরোত্তর বৃদ্ধির পথে, তার বিপরীতে কম দামে ভালো ক্ষমতার 5G প্রসেসরের সুবিধা দিতে পারছে Dimensity 1000,1200,800,720 ইত্যাদি প্রসেসর।

মজার ব্যাপার হচ্ছে স্ন্যাপড্রাগনের flagship 865, 865+ বা হালের 888 এর প্রায় সমান CPU, GPU, Performance নিয়েও দামের দিক দিয়ে কম ক্ষমতার স্ন্যাপড্রাগনের 7 সিরিজের প্রসেসরকে সহজেই হারিয়ে দিচ্ছে। এর সাফল্য আসতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি কোম্পানিটিকে; যার ফলশ্রুতিতে 2020 এর চতুর্থ প্রান্তিকে মিডিয়াটেকের প্রসেসরের মার্কেট শেয়ার খোদ স্ন্যাপড্রাগনকেও ছাড়িয়ে গেছে কিন্তু এভাবেই। আশা করা যায় সামনের দিনগুলোতে এ ধারা অব্যাহত থাকবে। আরও বেশি বৈচিত্র্যময় হবে স্মার্টফোন প্রসেসর, এগিয়ে যাবে মিডিয়াটেক।

Avatar

Ibrahim Hasan